মানুষের জীবনে দুঃখ কেন আসে? গীতা ও কর্মফলের গভীর ব্যাখ্যা।

আমরা সবাই জানি— ভগবান করুণাময়। তিনি আমাদের মনের কষ্ট, দুঃখ—সবই বুঝতে পারেন। তাহলে একটা প্রশ্ন আসে— আমাদের মনের সব ইচ্ছা, কৃষ্ণ কেন পূরণ করেন না? আসলে কি জানেন— আপনি যা চান… কৃষ্ণ অনেক সময় সেটাই হতে দেন। আপনি ভোগ চান… আপনি সুখ চান… আপনি নিজের মতো চলতে চান…

তখন কৃষ্ণ বলেন— “ঠিক আছে… তুমি তোমার মতো চল।” কারণ— তিনি আপনাকে স্বাধীনতা দিয়েছেন।আপনি কোন পথ বেছে নেবেন— সেটা আপনার সিদ্ধান্ত।

আপনি যা চেয়েছিলেন… সেটা পাওয়ার পরও— কেন মনে শান্তি আসে না? এই প্রশ্নগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে আসল সত্য… আপনার সব ইচ্ছা পূরণ হলেই, সুখ আসে না… সব ভোগেই শান্তি মেলে না…

অনেক সময়— যা আমরা চাই, সেটাই আমাদের দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বৃষ্টির মধ্যে একজন দুঃখী যুবক কাঁদছে

শাস্ত্র বলছে— আমরা এই পৃথিবীর বাসিন্দা নই… আমরা সবাই একসময় ছিলাম, গোলক বৃন্দাবনে!

 যেখানে— না ছিল দুঃখ, না ছিল মৃত্যু, না ছিল ভয়। সেখানে শুধু ছিল— কৃষ্ণ… আর কৃষ্ণসেবা! কিন্তু… একদিন… কিছু আত্মার মনে একটা চিন্তা এলো। “আমি নিজের মতো করে চলবো…” “আমি ভোগ করবো…” “আমি আলাদা আনন্দ চাই!” আর সেই মুহূর্তেই— জীবের পতন শুরু!

না! তিনি আমাদেরকে ভালোবাসেন, তাই তিনি জোর করেন না… আপনি ভোগ করতে চেয়েছেন, তাই তিনি বললেন—  “ঠিক আছে…পৃথিবীতে গিয়ে তুমি অভিজ্ঞতা নাও…” আর সেই অভিজ্ঞতার নাম—এই জড়জগৎ! এটা শাস্তির জগত না,এটা সুযোগও না… এটা একটা পরীক্ষা!

 আপনি যা চেয়েছেন— সেটার আসল রূপ দেখানোর জন্যই, আপনাকে এখানে আনা হয়েছে! আপনি ভাবছেন— ভোগ মানেই সুখ… কিন্তু সত্যটা কি জানেন? ভোগ শুরু হয় আনন্দ দিয়ে… শেষ হয় শূন্যতায়! ধরুন, আপনি অনেক টাকা উপার্জন করলেন। তারপর? আপনার মন তখন বলছে,আরও টাকা চাই…আপনি ভোগ করলেন, তারপর? আরও ভোগের তৃষ্ণা বাড়ে… ভোগ কখনো পূর্ণ করে না… ভোগ শুধু বাড়ায়! এটা আগুনের মতো। আপনি যত ঘি ঢালবেন…ততই দাউ দাউ করে জ্বলবে!

হ্যাঁ। কৃষ্ণ অন্তর্যামী! আপনি যা চান— তিনি সব জানেন… এবং অনেক সময়— তিনি তা পূরণ করেনও! কিন্তু… আপনি কি জানেন, কোথায়, কিভাবে, কোন রূপে সেটা পূরণ হবে? আপনি মানুষ হতে চাইলেন… কিন্তু, হতে পারেন, অসুস্থ শরীরে অল্প আয়ু নিয়ে… এবং কষ্টের পরিবেশে। আপনি ভোগ চাইলেন… কিন্তু পেলেন—দুঃখের প্যাকেজ!

 কারণ— আপনি শুধু ইচ্ছা করেছেন… কিন্তু ফল নির্ধারণ করেন— অদৃশ্য নিয়ন্তা! আপনি ভাবছেন— “আমি স্বাধীন…”

 কিন্তু, আপনি আপনার বাসনার দাস! বাসনা আপনাকে, এই পৃথিবীতে দুঃখ কষ্টের জগতে ঠেলে দেয়… জন্ম দেয়,আবার মারে। আজ মানুষ, কাল পশু… পরশু কীট!  এটাই বাস্তবতা!

 আপনি যা চান— সেই অনুযায়ী আপনি জন্ম পান! বাসনা আপনারই ভবিষ্যৎ জন্ম!

এই চক্র থেকে বের হবেন কিভাবে? আরও ভোগ করে? না, সব ছেড়ে পালিয়ে? না, শুধু কৃষ্ণকেন্দ্রিক বাসনা নিয়ে!

 কৃষ্ণ বলছেন— “মন্মনা ভব” “মন আমার মধ্যে রাখো” আপনি যদি— নিজের জন্য বাসনা চান, তাহলে আপনি মায়ায় বাঁধা পড়বেন! আর আপনি যদি, কৃষ্ণের জন্য চান— তাহলে মুক্ত হবেন! আজ আপনি, যে কামনা বাসনা চাইছেন… সেটা আপনাকে কোথায় নিয়ে যাবে জানেন? হয়তো অন্ধকারে, দুঃখে, এবং পুনর্জন্মের ফাঁদে… তাই সাবধান!

সব ইচ্ছা পূরণ হওয়া ভালো না… কিছু ইচ্ছা অপূর্ণ থাকাই আশীর্বাদ! কারণ, সব ইচ্ছা পূরণ হলে— আপনি চিরতরে হারিয়ে যেতে পারেন!

 মনে রাখবেন— কৃষ্ণ আপনার শত্রু নন… তিনি আপনার ইচ্ছার আয়না! আপনি যা চান— তিনি সেটার ফল দেখান…

 তাই— ভোগ চাইবেন না… স্বয়ং কৃষ্ণকে চান! কারণ— ভোগ আপনাকে ঘুরাবে… কৃষ্ণ আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দেবে! “ভোগ সুখ দেয় না—ভোগ শুধু ক্ষুধা বাড়ায়!” “আপনি যা চাইছেন—সেটাই আপনার ফাঁদ!” “কৃষ্ণ দেন, কিন্তু তিনি সাথে সাথে শিক্ষা দেন!” “বাসনা আপনাকে বানায়—আবার ভেঙেও দেয়!” সব ইচ্ছা পূরণ হওয়া মানেই মুক্তি নয়!

শ্রীকৃষ্ণ বলছেন— আমি সর্বত্র আছি। তাহলে একটা প্রশ্ন… যদি কৃষ্ণ সব জায়গায় থাকেন— তাহলে মানুষ পাপ করে কীভাবে? কৃষ্ণ কি দেখেন না? নাকি… আমরায় কিছু ভুল ভেবে বুঝেছি! আজকের এই কথাগুলো… শুধু জ্ঞান নয়, এটা তোমার আত্মার সামনে আয়না ধরবে।

আমরা মনে করি— কৃষ্ণ সব জায়গায় আছেন… তাহলে আমি যা পাপ করছি, তাতেও কৃষ্ণ কি আছেন? না। এই ভাবনাটাই ভুল।

গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলছেন— জীব নিজেই জড়ো প্রকৃতির, তিন গুণে আবদ্ধ হয়ে কাজ করছে। এই কথার মানে কি জানো? মানে হলো— তুমি যখন পাপ করো, তখন তুমি কৃষ্ণের সঙ্গে না… তুমি নিজের মনের দাস হয়ে যাচ্ছো। কৃষ্ণ তোমাকে একটা ভয়ংকর গুরুত্বপূর্ণ জিনিস দিয়েছেন। সেটা হলো স্বাধীনতা! তুমি ভালো করবে… নাকি খারাপ করবে… সেটা তুমি নিজেই ঠিক করবে।

কিছু যুবক নেশায় ডুবে অন্ধকার ঘরে বসে আছে

কৃষ্ণ তোমাকে বাধা দেন না। কেন? কারণ… ভালোবাসা কখনো জোর করে হয় না।

শুনে রাখো— তুমি পাপ করছো, তুমি অন্যায় করছো, এর জন্য কৃষ্ণ দায়ী না।

শ্রীকৃষ্ণ স্পষ্ট বলছেন— জীব নিজের কর্মফল নিজেই ভোগ করে… আমি কারোর পাপ বা পুণ্য গ্রহণ করি না। এই কথাটা…হাড় পর্যন্ত কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো কথা।

তুমি ভাবছো— আমি যা করছি, তা হয়তো কেউ দেখছে না। কিন্তু… তোমার প্রতিটা কাজ, তোমার প্রতিটা চিন্তা, এবং প্রতিটা ইচ্ছা, সবয়ি রেকর্ড হচ্ছে। কোথায়? তোমার নিজের কর্মফলে!

শ্রীকৃষ্ণ বলছেন— তোমার সব কাজ আমাকে সমর্পণ কর। কিন্তু আমরা কি করি? নিজের আনন্দ, নিজের লোভ, এবং নিজের কামনা, এইসবের জন্যই কাজ করি। ফল কী হয়? বন্ধন, দুঃখ এবং জন্ম-মৃত্যুর চক্র!

মানুষ ভাবে— এইটুকু পাপ করলে কিছু হবে না… একটু পাপ করলে সমস্যা নেই। কিন্তু… এই ‘একটু’ই তোমাকে ডুবিয়ে দেয়।

শাস্ত্র বলছে— কামনা-বাসনার পেছনে ছুটে মানুষ, জন্মের পর জন্ম… দুঃখই ভোগ করে। যজ্ঞার্থাৎ কর্মণো… অন্যথায় কর্ম বন্ধন সৃষ্টি করে। মানে— যদি কৃষ্ণের জন্য কাজ করো— তাহলে মুক্তি। আর যদি নিজের জন্য কাজ করো— সেটাই বন্ধন! এটা খুব সোজা… কিন্তু মানা খুব কঠিন! শাস্ত্র বলছে— মূর্খ মানুষ… নিজের তথাকথিত “স্বাধীনতা” আঁকড়ে ধরে রাখতে গিয়ে… সে নিজেই হারিয়ে ফেলেছে কৃষ্ণচেতনা। এর মানে কী? মানুষ জানে— এটা করা ভুল… এটা তাকে পতনের দিকে নিয়ে যাবে। তবুও সে সেটাই করে। কেন? কারণ… সে কৃষ্ণকে ভুলে গেছে।

যখন মানুষের মনে কৃষ্ণ থাকেন— তখন তার বিবেক জাগ্রত থাকে। সে ভালো-মন্দ বুঝতে পারে… ভুল পথে যেতে চায় না। কিন্তু… যখন সে ভাবে— আমি স্বাধীন… আমি যা খুশি তাই করবো… ঠিক তখনই— তার পতন শুরু হয়।

সে স্বাধীনতা চায়… কিন্তু বুঝতে পারে না— এই মিথ্যা স্বাধীনতাই তাকে বন্ধনে জড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে— সে জানে এটা পাপ… তবুও সেটাই করে। সে জানে এটা ভুল… তবুও সে নিজেকে থামতে পারে না! কারণ— তার ভিতরে আর কৃষ্ণ নেই… কৃষ্ণচেতনা নেই।

আর যেখানে কৃষ্ণ নেই— সেখানে অজ্ঞানতা, মোহ আর আসক্তিই রাজত্ব করে। তাই— সত্যিকারের স্বাধীনতা হলো—যা খুশি  তাই করা নয়, সত্যিকারের স্বাধীনতা হলো— কৃষ্ণের স্মরণে থেকে সঠিক পথ বেছে নেওয়া।

 কৃষ্ণ সর্বত্র আছেন… কিন্তু… তুমি তাঁর সঙ্গে আছো না। এর মানে কী? এর মানে— কৃষ্ণ কখনো তোমার থেকে দূরে যাননি… তুমিই ধীরে ধীরে তাঁর থেকে দূরে সরে গেছো। যিনি তোমার প্রতিটা শ্বাসে আছেন, যিনি তোমার হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দনে আছেন, যিনি সবসময় তোমার পাশে ছিলেন… তুমি—তাঁকেই ভুলে গেছো। তুমি ব্যস্ত হয়ে পড়েছো এই দুনিয়ার কাজে,অস্থায়ী সুখে, মানুষের স্বীকৃতিতে… আর এই ব্যস্ততার মাঝেই— তুমি হারিয়ে ফেলেছো তোমার আসল সম্পর্ক।

তাই তুমি একা অনুভব করো,ভেতরে শূন্যতা লাগে, মনে অশান্তি থাকে… কেন জানো? কারণ— যার উপস্থিতি তোমাকে পূর্ণ করত… তাকে তুমি ভুলে গেছো।

কৃষ্ণ তোমার খুব কাছেই আছেন, কিন্তু তোমার মন অন্যদিকে ব্যস্ত। তাই তুমি তাঁকে অনুভব করতে পারছো না!

কৃষ্ণ দূরে দাঁড়িয়ে নেশাগ্রস্ত যুবকদের করুণ চোখে দেখছেন

দূরত্বটা জায়গার নয়… দূরত্বটা তোমার চেতনার। তুমি যদি একবার থামো,নিজের ভিতরে তাকাও… সত্যি করে তাঁকে স্মরণ করো… তখন তুমি বুঝবে— কৃষ্ণ কখনো তোমাকে ছেড়ে যাননি… তুমিই শুধু তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলে।

তাই এখনো সময় আছে ফিরে আসো… তাঁর কাছে নয়— তাঁর সঙ্গে। তুমি যখন পাপ করো— কৃষ্ণ তোমার ভিতরে আছেন। কিন্তু, তুমি তাঁর দিকে তাকাচ্ছো না। তুমি মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছো। আর সেই মুহূর্তেই…  তুমি অন্ধ হয়ে যাও।

আজ নিজেকে একটা প্রশ্ন করো। আমি কি সত্যিই কৃষ্ণকে স্মরণ করে বাঁচছি? নাকি শুধু নিজের ইচ্ছার দাস হয়ে গেছি!

কারণ কৃষ্ণ কখনো দূরে যান না… আমরাই দূরে চলে যাই। পাপ করা মানে— কৃষ্ণকে ভুলে যাওয়া।

আর পুণ্য করা মানে— কৃষ্ণকে মনে রাখা। তাই সিদ্ধান্ত তোমার, তুমি কাকে বেছে নেবে!

Leave a Comment