হরিনাম করলে কি হয়? হরিনামের শক্তি ও মানুষের জীবনে এর প্রভাব

এই পৃথিবীতে অনেক নেশা আছে। যেমন, ড্রাগসের নেশা… মদের নেশা… সিগারেটের নেশা… টাকার নেশা… এবং ক্ষমতার নেশা! কিন্তু এসব নেশা মানুষকে ধ্বংস করে। মানুষের শরীর শেষ করে, মানুষের পরিবার শেষ করে,মানুষের চরিত্র শেষ করে,এবং মানুষের ভবিষ্যৎকেও শেষ করে দেয়!

কিন্তু একটা নেশা আছে— যে নেশা মানুষকে ধ্বংস করে না, বরং মানুষকে নতুন জীবন দেয়।

সেই নেশার নাম হলো— হরিনামের নেশা!

একটা মদের বোতল মানুষকে পশু বানিয়ে দেয়। আর একটা “হরে কৃষ্ণ” মানুষকে দেবতার পথে নিয়ে যায়! মদের নেশা মানুষকে রাস্তার পাশে ফেলে দেয়। আর হরিনামের নেশা মানুষকে কৃষ্ণের চরণে ফেলে দেয়। ড্রাগস মানুষকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়। এবং হরিনাম আত্মার ভিতরে সূর্য জ্বালিয়ে দেয়!

যে ছেলে একসময় প্রতিদিন নেশা করত, যে ছেলে রাতভর মদ খেত, যে ছেলে নিজের পরিবারকে কাঁদিয়েছে,এবং যে ছেলে জীবনের প্রতি আশা হারিয়ে ফেলেছিল।

সেই ছেলেই আজ মালা হাতে কাঁদছে কৃষ্ণের সামনে দাঁড়িয়ে, আর বলছে – “হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে” 

নেশাগ্রস্ত যুবকের হরিনামের মাধ্যমে ভক্তিময় জীবনে পরিবর্তনের দৃশ্য

এটাই হরিনামের শক্তি।

মায়াপুর-এ কত যুবক এসেছে— ড্রাগসে শেষ হয়ে যাওয়া, মদে ডুবে যাওয়া, নাইট ক্লাবে জীবন নষ্ট করা যুবক। তারা নবদ্বীপে এসে প্রথমে শুধু আরতি দেখেছে। হরিনাম শুনেছে,ভগবদ্গীতা শুনেছে,এবং ভক্তদের সঙ্গে থেকেছে!

তারপর আস্তে আস্তে কী হয়েছে?

যে হাত একসময় সিগারেট ধরত, সেই হাতে জপমালা উঠেছে। যে মুখ একসময় গালাগালি দিত, সেই মুখে কৃষ্ণ নাম উঠেছে। যে পা একসময় নাইট ক্লাবে নাচত, সেই পা এখন কীর্তনে নাচছে। এটাই হরিনামের অলৌকিক শক্তি!

 পৃথিবীর বিজ্ঞানের প্রযুক্তির দ্বারা এটা কোনদিন সম্ভব নয়।

বিজ্ঞান মানুষকে মোবাইল দিতে পারে, বিজ্ঞান মানুষকে গাড়ি দিতে পারে, দূরের পথ দ্রুতগামী যাওয়ার জন্য। বিজ্ঞান মানুষকে বড় বড় বিল্ডিং বানাতে সাহায্য করতে পারে।

কিন্তু বিজ্ঞান একজন নেশাখোরের হৃদয় বদলাতে পারে না। বিজ্ঞান একজন পাপীকে সাধু বানাতে পারে না।

কারণ,বিজ্ঞান শরীর বদলাতে পারে, কিন্তু হৃদয় বদলাতে পারে না! কিন্তু হরিনাম পারে।

একজন মানুষ যখন, সত্যি হৃদয় দিয়ে কৃষ্ণ নাম করে, তখন তার ভিতরের অন্ধকার কাঁপতে শুরু করে। কারণ নাম শুধু শব্দ নয়। নামের মধ্যে কৃষ্ণ স্বয়ং উপস্থিত!

 এই নাম মানুষকে পাপ ছাড়াতে বাধ্য করে। অনেকে ব্যক্তি জোর করে নেশা ছাড়তে চায়! কিন্তু পারে না।

কারণ ভিতরটা খালি।

মানুষের আত্মা আনন্দ চায়, আর সেই আনন্দ না পেলে সে নেশায় ডুবে যায়! কিন্তু যেদিন আত্মা হরিনামের স্বাদ পায়, সেদিন জাগতিক নেশা বিষের মতো লাগে। তখন আর জোর করে পাপ ছাড়তে হয় না।

পাপ নিজে থেকেই ছুটে পালায়!

কারণ কৃষ্ণ নামের আনন্দের সামনে এই পৃথিবীর সব আনন্দ ফিকে হয়ে যায়। হরিনামের এমনই ক্ষমতা যে, নাম মাতালকে পর্যন্ত ভক্ত বানায়! যারা একসময়— মদ খেত, জুয়া খেলত, মাংস খেত, রাতভর পাপ করত,এবং নাইট ক্লাবে নাচত, আজ তারাই কীর্তনে কাঁদছে। আজ তারাই ভোরে উঠে মঙ্গল আরতি করছে।

আজ তারাই বলছে— “কৃষ্ণ ছাড়া শান্তি নেই।” তাহলে বুঝুন— হরিনামের ক্ষমতা কত বড়!

কারণ কৃষ্ণ আমাদের ঘৃণা করেন না। আমরা কৃষ্ণকে ভুলে গেছি, কৃষ্ণ কিন্তু আমাদের ভুলে যাননি।

একজন মা যেমন পথভ্রষ্ট সন্তানকে বারবার ডাকেন, তেমনি কৃষ্ণও জিবদের ডাকছেন— “ফিরে এসো… আর কত অন্ধকারে থাকবে। তাই যখন একজন নেশাগ্রস্ত মানুষও একবার কৃষ্ণকে ডাকে, কৃষ্ণ তাকে ছেড়ে দেন না।

কৃষ্ণ একজন নেশাগ্রস্ত যুবককে ভালোবাসা ও আশ্রয় দিচ্ছেন

তিনি ধীরে ধীরে তার হৃদয় পরিষ্কার করেন।

ড্রাগসে আনন্দ নেই,মদে আনন্দ নেই, ধূমপানেও আনন্দ নেই।  ওগুলো প্রথমে সুখের অভিনয় করে, তারপর জীবনটা ছিন্নভিন্ন করে দেয়। প্রকৃত আনন্দ একমাত্র কৃষ্ণে। প্রকৃত শান্তি একমাত্র হরিনামে! এই কৃষ্ণনাম আমাদের ভিতরটা বদলে দেয়। একজন মানুষ অভিনয় করে ভালো হতে পারে, আমরা সিরিয়ালে দেখি খুবই ভালো মানুষ। কিন্তু ভিতরে ভিতরে সে নিজে বদলায় না। উনি শুধু ভালো ছিল অভিনয়ে!

কিন্তু হরিনাম ভিতর থেকে পরিবর্তন করে। তখন সে আর কাউকে কষ্ট দিতে পারে না, কারও ক্ষতি করতে পারে না,পাপ করতে গেলেও ভিতরে আগুন লাগে। কারণ হৃদয়ে কৃষ্ণ জেগে ওঠেন! পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রিহ্যাব সেন্টারের নাম হলো হরিনাম।

যে নাম— মাতালকে ভক্ত বানায়।নেশাখোরকে সাধু বানায়। অন্ধকার মানুষকে আলোর পথে আনে, মৃত হৃদয়কে জীবিত করে। সেই নাম যদি সত্যি হৃদয় দিয়ে করেন, আপনার জীবনও বদলে যাবে। আজ যদি আপনি নেশায় ডুবে থাকেন, পাপে ডুবে থাকেন, হতাশায় ডুবে থাকেন।

তাহলে শুনুন— আপনি শেষ হয়ে যাননি। একবার শুধু সত্যি হৃদয় দিয়ে ডাকুন— “হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে”  দেখবেন যে নেশা আপনাকে ধ্বংস করছিল, সেই নেশা ছুটে পালাবে। আর কৃষ্ণ নামের নেশা আপনার হৃদয় দখল করে নেবে। 

কারণ কৃষ্ণনাম শুধু মুক্তি দেয় না, কৃষ্ণনাম মৃত হৃদয়ে প্রেম জাগায়! কৃষ্ণনাম ভাঙা মানুষকে নতুন জীবন দেয়।কৃষ্ণনাম পাপীকে সাধু বানায়।

তাই আজ একটা সিদ্ধান্ত নিন। আর না…! আর মায়ার কাছে হারবেন না…! আর পাপকে অজুহাত বানাবেন না।

আজ থেকে অন্তত একবার সত্যিকারের হৃদয় দিয়ে বলুন— হে কৃষ্ণ তুমি আমার জন্ম জন্মান্তরের আপন, আর এই সংসারে যারা আছে তারা সবাই স্বার্থ দেখে। দেখবেন… যে হৃদয় বছরের পর বছর অন্ধকারে ডুবে ছিল, সেই হৃদয়েও একদিন কৃষ্ণের আলো জ্বলে উঠবে!

শয়তান কখনো এসে মানুষকে বলে না— “চলো আজই নরকে যাই।” সে শুধু মানুষের কানে কানে বলে— “এখন একটু পাপ কর… এখন একটু ভোগ কর… এখন একটু নেশা কর… পরে তো হরিনাম আছেই। এভাবেই মানুষ ধ্বংস হয়ে যায়।

আজ কত যুবক রাতে সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে ভাবছে— “আমি তো পরে নাম করব।” কেউ মদের বোতল হাতে নিয়ে ভাবছে— “শেষ বয়সে ভক্ত হয়ে যাব।” কেউ অবৈধ সম্পর্কে ডুবে আছে… কেউ পর্নোগ্রাফিতে ডুবে আছে, কেউ প্রতিদিন মিথ্যা বলছে, প্রতারণা করছে, মা-বাবাকে কাঁদাচ্ছে।

তবুও ভিতরে ভিতরে নিজেকে সান্ত্বনা দিচ্ছে— কৃষ্ণ তো দয়ালু… পরে ক্ষমা করে দেবেন।

কিন্তু শুনে রাখুন— কৃষ্ণ দয়ালু ঠিকই, কিন্তু নামকে অপমান করলে সেই দয়া লুকিয়ে যায়। তুমি বলছো বৃদ্ধ হলে হরিনাম করব! তাহলে মৃত্যুর আগে তুমি নাম করতে পারবে — এই গ্যারান্টি কে দিয়েছে ? আপনি কি বলতে পারবেন আপনার মৃত্যু কখন আসবে? না!

আপনি ভাবছেন বৃদ্ধ বয়সে নাম করবো। তাহলে, যে ছেলেটা গতকাল রাস্তায় মারা গেল, সে কি ভেবেছিল আজ তার শেষ দিন?

যে মানুষটা রাতে ঘুমিয়েছিল, সে কি জানত সকালে তার লাশ বের হবে?

শুনুন মৃত্যু কাউকে সময় দেয় না। মৃত্যু কখনো আপনার দরজায় কড়া নাড়ে না। সে হঠাৎ আসে!

আর তখন টাকা কাজে লাগে না, বন্ধু কাজে লাগে না, শরীর কাজে লাগে না।

শুধু কাজ লাগে— কৃষ্ণ নাম।

 নেশা আপনাকে সুখ দেয় না, ওটা দুঃখের ফাঁদ! আর ধূমপান এটা স্টাইল নয়— এটা ধীরে ধীরে আপনার আত্মাকে দূষিত করছে। অনেকে মদ্যপান করে ভাবে, আমি স্বাধীন,এবং আমি সব থেকে বেশি সুখী। কিন্তু সে নিজেও জানে না যে, সে মস্তিষ্কের ডোপামিনের ফাঁদে আটকা পড়ে আছে!

শয়তান প্রথমে মানুষকে পাপের স্বাদ দেয়… তারপর সেই পাপ দিয়েই মানুষকে শিকলে বেঁধে ফেলে। আজ কত যুবক গভীর রাতে একা কাঁদে। ভিতরে ভিতরে শেষ হয়ে গেছে। হাসছে বাইরে কিন্তু ভিতরে আগুন জ্বলছে!

কারণ কৃষ্ণকে ছাড়া আত্মা কখনো শান্তি পায় না।কৃষ্ণ এখনো আপনাকে ভালোবাসেন বলে,কৃষ্ণ আপনাকে এখনও ডাকছেন। আয় ফিরে আয় আমার চরণে, তোর সব পাপ আমি মুক্ত করে দেবো।

আপনি হয়তো ভাবছেন— আমি অনেক পাপী আমাকে দিয়ে হবে না। এটাই মায়ার সবচেয়ে বড় মিথ্যা।

কারণ কৃষ্ণ সাধুদের জন্য শুধু আসেননি। তিনি পাপীদের উদ্ধারের জন্য এসেছেন! যদি পাপীদের জন্য দরজা বন্ধ থাকত, তাহলে জগাই-মাধাই মুক্তি পেত না। যদি পাপীদের জন্য নাম না থাকত, তাহলে রত্নাকর কখনো বাল্মীকি হতেন না। যদি কৃষ্ণ শুধু পবিত্র মানুষদের ভালোবাসতেন, তাহলে এই কলিযুগে কেউ বাঁচত না। কারণ, কলিযুগে ৯৯% মানুষ অধার্মিক!

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু দেখলেন— কলিযুগের মানুষ দুর্বল। মানুষ পাপে ডুবে যাবে। মানুষের তপস্যা করার শক্তি থাকবে না। তাই তিনি মুক্তির দরজা সবার জন্য খুলে দিলেন! তিনি বলেননি— “আগে পবিত্র হও, তারপর নাম করো।”

তিনি বলেছেন— যে অবস্থায় আছো, সেখান থেকেই নাম শুরু করো। এটাই কলিযুগের সবচেয়ে বড় আশা।

কলিযুগের হতাশ যুবকের সামনে হরিনাম সংকীর্তনের আলো ও আধ্যাত্মিক জাগরণ

অনেকে ভাবেন— প্রথমে পাপ করবো তারপর মালা হাতে বসব, সব ক্লিয়ার হয়ে যাবে। হরিনাম এটা কোনো ব্যবসা নয়। এটা প্রেম! কৃষ্ণ নাম কোনো আদালতের ঘুষ নয়। এটা হৃদয়ের কান্না!

আপনি যেদিন সত্যি কান্না নিয়ে বলবেন— “হে কৃষ্ণ… আমি হেরে গেছি… আমাকে বাঁচাও।

সেদিনই আপনার জীবন বদলাবে। সেই দিনই ভগবান আপনার পাপ ক্ষমা করবেন। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পাপীকেও নাম বদলে দিতে পারে! আপনি যতই খুনি হন নেশাখোর হন অশ্লীলতায় ডুবে থাকুন হাজার পাপ করুন।

তবুও যদি সত্যি হৃদয় দিয়ে একবার বলেন— “হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে, হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে”  শুধুমাত্র এই মহামন্ত্র। তাহলে আপনার ভিতরের পাপের অন্ধকার কাঁপতে শুরু করবে।

কারণ এই নাম সাধারণ শব্দ নয়। এটা আগুন! এটা আত্মাকে পরিষ্কার করে। এবং এটা হৃদয়ের ভিতরের শয়তানকে জ্বালিয়ে দেয়!

একটা সিগারেট আপনাকে শান্তি দিতে পারেনি। এক বোতল মদ আপনাকে শান্তি দিতে পারেনি। একটা হারাম সম্পর্ক আপনাকে শান্তি দিতে পারেনি, একটা রাতের ভোগ আপনাকে শান্তি দিতে পারেনি।

কিন্তু— এক ফোঁটা শুদ্ধ হরিনাম, একবার সত্যিকারের “কৃষ্ণ” ডাক, মানুষের জীবন উল্টে দিতে পারে।

আজ সিদ্ধান্ত নিন! আর নয়। আর শয়তানের দাসত্ব নয়। আর নেশার কারাগার নয়। আর পাপের অন্ধকার নয়!

আজ থেকে— হাতে মালা নিন। মুখে কৃষ্ণ নাম নিন। কান্না নিয়ে কৃষ্ণকে ডাকুন।

কারণ মনে রাখবেন— আপনি কৃষ্ণকে ভুলে যেতে পারেন, কৃষ্ণ কিন্তু এখনও আপনাকে ভুলে যাননি।  এক শুদ্ধ কৃষ্ণনামই যথেষ্ট আপনার জন্ম জন্মান্তরের সমস্ত পাপ নষ্ট করতে। কিন্তু সেই শুদ্ধ নাম নেওয়ার যোগ্যতা আমাদের নেই।

তাই— আমরা বারবার নাম জপ করি, যতক্ষণ না একদিন সত্যিকারের হৃদয় দিয়ে “কৃষ্ণ” বলতে পারি। যেদিন চোখে জল নিয়ে কৃষ্ণকে ডাকতে পারবো, সেই দিনের সেই নাম আর শব্দ থাকবে না। সেই নাম হয়ে যাবে “সাক্ষাৎ কৃষ্ণ”!

আপনি যখন “কৃষ্ণ” বলেন… তখন ভুল করেও ভাববেন না এটা শুধু শব্দ। তখন শুধু একটি কথা ভাববেন যে, এই ডাক… আর সেই ডাকের ওপারে আছেন—স্বয়ং কৃষ্ণ।

আজ থেকে শুধু ঠোঁট দিয়ে না… হৃদয় দিয়ে একবার বলুন— “হরে কৃষ্ণ…” দেখবেন— আপনার জীবন বদলাতে শুরু করবে… আপনি হয়ে উঠবেন এক তেজস্বী কৃষ্ণ ভক্ত পুরুষ!

Leave a Comment