নিষ্পাপ শিশু কেন দুঃখের পৃথিবীতে জন্ম নেয়?

আমরা অনেকেই বলি—একটা শিশু নিষ্পাপ। ঠিক আছে, যদি সত্যিই সে সম্পূর্ণ নিষ্পাপ হয়— তাহলে একটা প্রশ্ন উঠে আসে। যার কোনো পাপ নেই, যার কোনো দোষ নেই— সে এই দুঃখেভরা পৃথিবীতে জন্ম নেবে কেন?

তার তো থাকা উচিত ছিল বৈকুণ্ঠ ধামে। চিরশান্তিতে, এবং চির আনন্দোময় জীবনে!

তাহলে কেন সে এই পৃথিবীতে এলো— যেখানে আছে কষ্ট, রোগ, ভয়,আর মৃত্যু।

এই প্রশ্নটা সরল না— এটা এমন এক প্রশ্ন, যা আমাদের বিশ্বাসকে নাড়িয়ে দেয়। আমরা যদি বলি— শিশু সম্পূর্ণ নিষ্পাপ। তাহলে তার কষ্টের কোনো যুক্তি থাকে না!

আর যদি বলি— সবকিছুই কোনো কারণ ছাড়া হচ্ছে, তাহলে এই সৃষ্টির ন্যায়ের ভিত্তিটাই ভেঙে পড়ে।

একটা নবজাতক শিশু এইমাত্র পৃথিবীতে এসেছে। সে কিছুই জানে না, কারো ক্ষতি করেনি, কারো সাথে প্রতারণা করেনি। তবুও— কেউ জন্মেই অসুস্থ, আর কেউ জন্মেই দুঃখের মধ্যে থাকে। অন্যদিকে কিছু শিশু জন্মায় সম্পূর্ণ সুস্থভাবে। তাহলে প্রশ্নটা খুব স্বাভাবিক।

একই পৃথিবীতে, একই জন্ম— তবুও এমন ভিন্নতা কেন। এটা কি শুধু মায়ের গর্ভের অবস্থা?

নাকি জেনেটিক কারণ। নাকি এর পেছনে আরও গভীর কোনো কারণ আছে—যাকে আমরা বলি “কর্মফল”।

এখন আসল প্রশ্ন— এটা কি ন্যায়বিচার, নাকি নির্মম অন্যায়!

আমরা অনেকেই বলি— “শিশু তো নিষ্পাপ!” ঠিক আছে, যদি সে নিষ্পাপ হয়— তাহলে সে কষ্ট পাচ্ছে কেন।

কেউ বলবে— এটা শরীরের এবং এটি প্রকৃতির নিয়ম। আবার কেউ বলবে— এটা আত্মার দীর্ঘ যাত্রার ফল।

আত্মার দীর্ঘ যাত্রার ফলে দুঃখ-কষ্টে জন্ম নেওয়া একটি শিশু

কিন্তু যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক— এই প্রশ্ন আমাদের সামনে একটা আয়না তুলে ধরে। আমরা কি সত্যিই জীবনের সবকিছু বুঝে ফেলেছি, নাকি এখনো অনেক কিছু আমাদের বোঝার বাইরে! এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই আসল পথ!

কারণ, প্রশ্নটাই আমাদের গভীরে যেতে শেখায়। এখন বলুন— একটা শিশুর প্রতি ঈশ্বর দয়া দৃষ্টি হলেন, আরেকটি শিশুর প্রতি ঈশ্বর নির্দয় হলেন কেন। যদি আপনি বলেন— “না না, শিশু তো নিষ্পাপ!”

তাহলে আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করি— নিষ্পাপ হলে শিশুটি শাস্তি কেন পাই? উত্তর দিতে পারবেন।

 আমরা ছোট থেকে একটা মিথ্যে শুনে বড় হয়েছি! “শিশুরা দেবতার মতো এবং নিষ্পাপ। এটা আধা সত্য, আর আধা সত্য মানে পুরো মিথ্যে! যদি সবাই নিষ্পাপ হয়ে জন্মাতো— তাহলে কেউ ধনী পরিবারে কেন জন্মায়, কেউ রাস্তায় কেন জন্মায়? কেউ সুস্থ, কেউ পঙ্গু কেন।

মূল কথা হলো যিনি নিষ্পাপ! তিনি এই জড় জগতে থাকবেন না, তিনি থাকবেন শ্রীকৃষ্ণের চরণে। যার পাপ নেই তার জন্য এই জড়জগৎ নয়,তার জন্য অপেক্ষা করে কৃষ্ণধাম! এই জগতে কেউ প্রতিবন্ধী আবার কেউ গরিব! এটা কেন হয়? এই বৈষম্য কোনো কাকতালীয় না!

 এর পেছনে আছে— অদৃশ্য বিচার, নির্দয় হিসাব এবং কর্মফলের কঠিন আইন!

ধরুন— একজন মানুষ সারাজীবন মানুষকে ঠকিয়েছে, অন্যের কষ্ট দিয়েছে এবং পাপ করে গেছে। কিন্তু মৃত্যুর আগে কেউ তাকে শাস্তি দিতে পারেনি।

 আপনি কি ভাবছেন— “সে বেঁচে গেল?” না! প্রকৃতি কাউকে ছেড়ে দেয় না! সে আবার জন্ম নেবে।  কিন্তু এবার সে— কষ্ট নিয়ে জন্মাবে, দুঃখ নিয়ে জন্মাবে, এবং অসহায় হয়ে জন্মাবে।

 তখন আপনি বলবেন— “আহা! বেচারা নিষ্পাপ শিশু…” কিন্তু সত্য হলো— সে নতুন দেহে পুরনো হিসাব শোধ করছে!

মহাভারতের শান্তিপর্বে ভীষ্মদেব বলেন— মানুষ গর্ভেই পূর্বজন্মের সুখ-দুঃখ ভোগ শুরু করে!

একবার ভেবে দেখুন— জন্মের আগেই আপনার ভালো মন্দ কর্মের বিচার শুরু! আপনি ভুলে গেছেন— কিন্তু আপনার কর্ম ভুলে যায়নি! এই পৃথিবী— কোনো খেলার মাঠ না, কোনো র‍্যান্ডম ঘটনা না। এটা একটা আদালত!

শ্রীকৃষ্ণ পাপী ও ধর্মপ্রাণ ব্যক্তির কর্মফলের বিচার করছেন

এখানে— প্রতিটা কাজের হিসাব হয়, প্রতিটা চিন্তার বিচার হয়, এবং প্রতিটা পাপের ফল ঠিকই আসে!

 আর সেই ফল— এই জন্মে না হলে পরের জন্মে!

একটা সত্য কথা শুনুন— আপনি মরবেন, আমিও মরবো, শুধুমাত্র সময়ের ব্যাপার মাত্র! তারপর? আবার জন্ম আবার কষ্ট,এবং আবার মৃত্যু। এই চক্র থেকে আপনি পালাতে পারবেন না!

 কিন্তু একটা রাস্তা আছে। যদি কেউ— ছোটবেলা থেকেই হরিনাম করে, এবং ভগবানের শরণ নেয়। তাহলে— তার কর্মের শিকল কেটে যেতে শুরু করে! এবং তার পাপের বোঝা হালকা হয়!

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেন— “তুমি আমার চরণে স্মরণ নিলে,আমি তোমাকে সব পাপ থেকে মুক্তি দেবো।”

এটা শুধু ধর্ম না— এটা মুক্তির পথ!

 অনেকে বলে— “পাপীরাই শুধু পৃথিবীতে জন্মায়” এটা সম্পূর্ণভুল! দেবতারাও এই পৃথিবীতে জন্ম নিতে চায়!

কারণ— এখানেই ভক্তি করা যায়। এখানেই একমাত্র মুক্তি পাওয়া সম্ভব! আজ একটা কথা মাথায় ঢুকিয়ে নিন— “শিশু নিষ্পাপ”— এটা পুরো সত্য না! পুরো সত্য হলো— আপনি, আমি সবাই—কর্মফলের বন্দী! এই জন্ম এটা শাস্তি না, এই জগত কাকতালীয় না, এটা একটা সুযোগ!

 আপনি কি এই সুযোগ নষ্ট করবেন? নাকি জীবন বদলাবেন। এই সম্পূর্ণ সিদ্ধান্ত শ্রীকৃষ্ণ আপনার হাতেই দিয়েছেন! তাই আজ থেকেই হরিনাম শুরু করুন… নাহলে এই চক্র আপনাকে ছাড়বে না!

তুমি কি কখনো ভেবেছো— একটা মশা মারলে সেটা কি পাপ? যদি পাপ হয়— তাহলে আমরা প্রতিদিন পাপ করছি।

 আর যদি পাপ না হয়— তাহলে শাস্ত্রে কেনো বলা হয়েছে— জীব হত্যা মহাপাপ।

আজকের এই প্রশ্নটা ছোটো না, এটা তোমার প্রতিটা কাজের সাথে জড়িত। তুমি রাতে ঘুমাচ্ছো একটা মশা এসে কামড় দিলো, আর তুমি বিরক্ত হয়ে তাকে মেরে ফেললে। এটা কি ভুল নাকি এটা স্বাভাবিক।

শাস্ত্রো বলছে— পিঁপড়ে,উকুন,মশা, এবং মাছি। এদের বধের জন্যও পাপের ফল ভোগ করতে হয়!

 মানে— ছোট প্রাণী বলে পাপ কম এই ধারণা ভুল।

 তাহলে আমরা কী সবাই পাপী? আমরা হাঁটতে গিয়ে পিঁপড়ে মেরে ফেলছি, নিজের ঘরেও মশা মারছি।

 তাহলে কি আমরা সবাই দোষী? উত্তরটা এতো সহজ না, কিন্তু সত্যটা খুব কঠিন।

শাস্ত্রো একটা জিনিস বলে- তোমার মনোভাব, অর্থাৎ intention. তুমি কি আনন্দের জন্য হত্যা করছো, নাকি বাধ্য হয়ে।

কেউ যদি মশা হত্যা করে আনন্দ পায়— সেটা ভয়ংকর পাপ। একটা মশা তোমাকে রোগে আক্রান্ত করে দিতে পারে।

যেমন ডেঙ্গু ম্যালেরিয়া। কি করবে তখন? তুমি কি বসে থাকবে? না। তখন আত্মরক্ষার প্রয়োজন! কিন্তু এটাকে অজুহাত বানানো যাবে না‌।

কিন্তু আমরা কি করি?

যেখানে সেখানে আমরা ময়লা ফেলি, এবং নিজের ঘর পরিষ্কার রাখি না। তারপর— মশা হয় এবং পোকা হয়। তারপর আমরা নিজেই তাদের হত্যা করে মারি!

আসল দোষ কোথায়? আমাদের মধ্যেই।

 শাস্ত্র বলছে— পরিবেশ পরিষ্কার রাখো, খাবার ঢেকে রাখো, ঘর পরিষ্কার রাখো, এবং নিজের দেহকে পরিষ্কার রাখো। তাহলে পোকামাকড় আর আসবে না!

একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো— অনিচ্ছাকৃত পাপ আর ইচ্ছাকৃত পাপ—এক না। তুমি যদি না জেনে করো— সেটা ক্ষেত্রে আলাদা। কিন্তু জেনে-শুনে করো সেটা গুরুতর!

শাস্ত্র বলছে— হরিনাম সংকীর্তন অনিচ্ছাকৃত পাপ দূর করতে সাহায্য করে।

 কিন্তু— ইচ্ছাকৃত পাপ? সেটা থেকে বাঁচতে হলে— নিজের জীবনকে বদলাতে হবে। তুমি ভাবছো— এই ছোট্ট একটা মশা, কিন্তু— তারও জীবন আছে তারও ভয় আছে, এবং তারও বাঁচার ইচ্ছা আছে।

আর তুমি— তার জীবন কেড়ে নিচ্ছো।

বৃন্দাবনের এক নির্জন কুঞ্জে এক সাধু গভীর ধ্যানে বসে আছেন। তার মন পুরো ডুবে আছে রাধারানীর চরণে… চারপাশ নিস্তব্ধ… আছে শুধু ভক্তির স্পন্দন। হঠাৎ— একটি বিছা পোকা এসে তার হাতে কামড় বসাল।

ধ্যানরত এক সাধুকে বিষাক্ত পোকা কামড় দিচ্ছে, দূর থেকে একজন যুবক সেই দৃশ্য দেখছে

তীব্র যন্ত্রণা, কিন্তু সাধুর চোখে রাগ নেই বিরক্তি নেই। তিনি ধীরে ধীরে পোকাটিকে হাত থেকে নামিয়ে মাটিতে রেখে দিলেন।

কিছুক্ষণ পর— আবার সেই পোকা উঠল এবং আবার কামড় দিল! আবার যন্ত্রণা। আবার সাধু শান্তভাবে তাকে সরিয়ে দিলেন। এই দৃশ্য দূর থেকে এক ব্যক্তি দেখছিলেন। তার আর সহ্য হলো না। দৌড়ে এসে বললেন— “বাবা! আপনি এটা কী করছেন? ও আপনাকে বারবার কামড়াচ্ছে! একবার মেরে ফেললেই তো সব শেষ। তখন আপনাকে আর কষ্ট পেতে হবে না!

সাধু মৃদু হেসে বললেন— ঐ পোকা যদি তার স্বভাব ত্যাগ না করে, তাহলে আমি আমার স্বভাব ত্যাগ করি কিভাবে।

তার স্বভাব  হলো কামড়ানো এবং সে ভালো-মন্দ বোঝে না। আর আমার স্বভাব… ক্ষমা করা। তারপর সাধু আবার চোখ বন্ধ করলেন… যেন কিছুই ঘটেনি।

কিন্তু ওই মানুষটা দাঁড়িয়ে রইল স্তব্ধ হয়ে। কারণ সে বুঝতে পারল— মানুষ হওয়া মানে শুধু বাঁচা না, নিজের স্বভাবকে রক্ষা করা। এই পৃথিবীতে অনেক “বিছা পোকা” আছে মানুষের রূপে। কেউ তোমাকে কষ্ট দেবে, কেউ বিশ্বাস ভাঙবে, কেউ অপমান করবে… তুমি কি তাদের মতো হয়ে যাবে? না। তুমি যদি সত্যিই সাধুর পথে চলতে চাও— তাহলে তোমার স্বভাব হবে ক্ষমা, দয়া, এবং সহনশীলতা।

কারণ— খারাপ মানুষ তার স্বভাব অনুযায়ীই আচরণ করবে। কিন্তু তুমি কে—তা নির্ভর করে তোমার প্রতিক্রিয়ার উপর।

এই পৃথিবী তোমাকে বদলাতে পারবে না যদি তুমি নিজের স্বভাব না বদলাও। আর যেদিন তুমি, কষ্টের মধ্যেও ভালো থাকতে শিখবে— সেদিনই তুমি সাধারণ মানুষ থেকে, উচ্চ আত্মায় পরিণত হবে।

আজ নিজেকে জিজ্ঞেস করো— আমি কি অপ্রয়োজনে কাউকে কষ্ট দিচ্ছি? আমি কি সচেতন? পাপ শুধু বড় কাজ না।

 পাপ লুকিয়ে থাকে— তোমার ছোট ছোট অভ্যাসে। এবং ছোট ছোট অজুহাতে!

Leave a Comment