অনেকেই বলেন— “আমি তো কারও কোন ক্ষতি করিনি, তাহলে আমার জীবনেই এত কষ্ট কেন?”
তুমি কি কখনও আকাশের দিকে তাকিয়ে বলেছো— “হে ভগবান! আমি কি দোষ করেছি?” আজ তোমার এই প্রশ্নের উত্তর তুমি পাবে। কিন্তু সাবধান, এই উত্তর তোমার মন ভেঙে দিতে পারে, তোমার অহংকার গুঁড়িয়ে দিতে পারে, তোমার ভিতরের মিথ্যে ‘নির্দোষ’ ভাবটাকে আগুনে পুড়িয়ে দিতে পারে।
শুনে রাখো— “আমি কোনো অন্যায় করিনি”— এই কথাটা সত্য নয়। এটা আত্মপ্রবঞ্চনা, এটা অজ্ঞানতা। এটাকে শাস্ত্রের ভাষায় বলে—পাগলের প্রলাপ। আচ্ছা তুমি বলছো তুমি নির্দোষ!
তাহলে একটা প্রশ্ন— তুমি কি এই জগতে নিজের ইচ্ছায় এসেছো? না।
তুমি এসেছো কারণ— তোমার কর্ম তোমাকে টেনে এই জগতে এনেছে।
শাস্ত্র স্পষ্ট বলেছে— “যেই মাত্র জীব কৃষ্ণ ভুলি গেল, সেই দোষে মায়া তারে গলায় বাঁধিল।”
এই কথার মানে কি? মানে হলো— তুমি ভগবানকে ভুলেছো এইটাই তোমার প্রথম অপরাধ। এইটাই মূল পাপ!
আর সেই ভুলের শাস্তি হলো— এই জড় জগতে পতন।
ভালো মানুষের সঙ্গে খারাপ ঘটনা কেন ঘটে?
অনেকে বলে— “আমি তো কাউকে মারিনি, আমি তো কাউকে কোন ক্ষতি করি না, তাহলে আমি কেন দুঃখ পাই,আমি ভালো মানুষ।” এই কথা কি সত্যি?
তাহলে আমরা আরেকটু গভীরে যায়…
ধরো, রাস্তা দিয়ে তুমি হাঁটছো, কত শত পিপীলিকা তোমার পায়ের নিচে পিষে যাচ্ছে।
তুমি নিঃশ্বাস নিচ্ছো— অসংখ্য অণুজীব তোমার শরীরে প্রবেশ করে মারা যাচ্ছে।
তুমি কথা বলছো— একটা ভুল শব্দ কারও হৃদয় ভেঙে দিচ্ছে।
তুমি খাবার খাচ্ছো, কত প্রাণীর জীবন নিয়ে সেই খাবার তোমার প্লেটে এসেছে।
তুমি কি ভাবো— এসবের কোনো হিসাব নেই? তুমি যদি মনে কর আমি না জেনে করেছি, তাই আমি শাস্তি পাব না, তাহলে তুমি ভুল ভাবছো। এই জগতে— একটা শ্বাস,একটা পদক্ষেপ, একটা চিন্তা সবকিছুর হিসাব আছে।
তুমি যদি বলো— “আমি কারও ক্ষতি চাই না।” কিন্তু তুমি কি জানো— তোমার আরামের জন্য অন্য কেউ পরিশ্রম করছে, তোমার সুখের জন্য অন্য কেউ কষ্ট পাচ্ছে। তুমি এই পৃথিবীর সম্পদ ভোগ করছো। কিন্তু যার সম্পদ… তাকে কি তুমি মনে রেখেছো? না। তুমি কৃতজ্ঞ নও। তুমি ভোগী! তুমি অধিকার দাবি করছো কিন্তু কর্তাকে ভুলে গেছো।
এটাই তো পাপের শিখর!
এখন একটু গভীরে যাও। এই জগত ব্রহ্মাণ্ডে কোনো কিছুই আমাদের না। সবকিছুই ভগবানের সম্পদ! আমরা শুধু ভোগ করছি—ধার করা জিনিস। আমরা ভগবানের দ্রব্যকে নিজের বলে দাবি করি। অহংকার করে বলি—“এটা আমার।”
কিন্তু সত্যিটা কী জানো?
আমরা যে পৃথিবীতে বাস করি,যে মাটিতে দালান উঠাই, এই মাটি আমাদের না। এটা ভগবানের সৃষ্টি। তার দেওয়া জায়গায় ঘর বানিয়ে আমরা সেই কর্তাকেই ভুলে যাই। আর যদি কেউ অন্যের জিনিস জোর করে নিজের বলে নেয়, তখন মালিকের কষ্ট হয়।
ঠিক তেমনি— যখন আমরা বলি— “আমার বাড়ি… আমার দেহ… আমার স্ত্রী… আমার সংসার।
তখন যেন ভগবান নীরবে দাঁড়িয়ে বলেন— “তুমি মালিক নও, তুমি শুধু আমার দেওয়া জিনিস কিছুদিনের জন্য ব্যবহার করছো। একদিন সময় আসবে, যেদিন সব ‘আমার’ শব্দ নীরব হয়ে যাবে।
আর থাকবে শুধু একটাই সত্য— তুমি মালিক নও তুমি শুধু ব্যবহারকারী ছিলে।
এই পৃথিবী কি আনন্দের জায়গা নাকি দুঃখের?
আমরা অনেকেই ভাবি—এই পৃথিবী ভোগ করার জায়গা, আনন্দের জায়গা। কিন্তু এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। ভগবান নিজেই বলেছেন— “দুঃখালয়ম্ অশাশ্বতম্” অর্থাৎ, এই জগৎ দুঃখের স্থান… এবং এটি অস্থায়ী।
উপর থেকে এই পৃথিবীকে খুব সুন্দর মনে হয়—যেমন সমুদ্রের উপরিভাগ। শান্ত ঝলমলে আকর্ষণীয়। কিন্তু তুমি যদি সমুদ্রের গভীরে নামো—তখন বুঝবে, ভিতরে আছে অন্ধকার, চাপ, এবং অজানা ভয়। ঠিক তেমনই আমাদের এই জীবন। বাইরে থেকে দেখলে — সাফল্য ভালোবাসা, সম্পর্ক সবকিছুই আনন্দময় মনে হয়।
কিন্তু একটু গভীরে গেলেই দেখা যায়— সেই ভালোবাসার মধ্যেই কষ্ট, সেই সম্পর্কের মধ্যেই ভাঙন, এবং সেই সাফল্যের মধ্যেই ভয়। এই জগতে আছে উদ্বেগ, আছে আঘাত, আছে বিশ্বাসঘাতকতা। আর আছে অবশ্যম্ভাবী মৃত্যু!এখানে কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। তুমি যদি এই অস্থায়ী জগতে বসে স্থায়ী সুখ খুঁজতে চাও— তাহলে তুমি শুধু ভুল করছো না, তুমি নিজের সাথেই প্রতারণা করছো। কারণ, এই পৃথিবী আমাদের চিরস্থায়ী আশ্রয় না। এটা একটা পথ এবং একটা শিক্ষার জায়গা!
এই সত্যটা যখন তুমি গভীরভাবে বুঝবে— তখন আর ছোট কষ্ট তোমাকে ভেঙে দিতে পারবে না। তুমি জানবে—“এটাও অস্থায়ী।” এবং তখনই তুমি খুঁজতে শুরু করবে সেই সত্যিকারের শান্তি! যেটা এই জগতের বাইরে, যেটা কখনো শেষ হয় না।
দুঃখ কষ্ট পেলেই আমরা কেন ভগবানকে দোষ দিই?
তুমি যখন দুঃখ পাও তখন বলো— ভগবান কেন আমার সাথে এমন করলেন। কিন্তু কখনো তুমি এক মুহূর্ত থেমে, নিজেকে জিজ্ঞেস করো না যে, আমি কোথায় ভুল করেছি। এবং আমি কতবার ভগবানকে ভুলে গেছি!
আমরা সহজেই অভিযোগ করি, কিন্তু নিজের ভেতরে তাকাতে চাই না। আমরা অন্যের দিকে আঙুল তুলি, কিন্তু নিজের ভুলগুলো এড়িয়ে যাই।
সত্যটা হলো— দুঃখ শুধু প্রশ্ন করার জন্য আসে না, দুঃখ আসে আমাদের চোখ খুলে দেওয়ার জন্য। যেদিন তুমি অভিযোগ বন্ধ করে নিজের দিকে তাকাবে, সেদিনই তুমি নিজেকে বদলাতে শুরু করবে। আর সেই পরিবর্তনই তোমাকে সত্যিকারের শান্তির দিকে নিয়ে যাবে।
শুনে রাখো— তুমি নির্দোষ নও, তুমি শুদ্ধ নও, এবং তুমি পাপমুক্ত নও। তুমি একজন পতিত জীব!
যে ভগবানকে ভুলে গেছে। আর এই জগৎ— তোমার শাস্তির ক্ষেত্র,আর তোমার পরীক্ষার ক্ষেত্র!
আচ্ছা,তাহলে মুক্তি কোথায়? আমরা কি কোনদিন এই সংসারের দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তি পাবো না?
শাস্ত্র পথ দেখিয়েছে— এই দুঃখময় জগতে থেকেও, এই মায়ার বন্ধনে থেকেও, তুমি মুক্তি পেতে পারো।
কিভাবে? একমাত্র হরিভজন এইটাই একমাত্র পথ।
আজ একটা কথা মনে রাখো— তুমি যতদিন বলবে— “আমি নির্দোষ”— ততদিন তুমি অন্ধই থাকবে।
যেদিন তুমি বলবে— “হে ভগবান, আমি অপরাধী…” “আমি ভুল করেছি…” “আমি আপনাকে ভুলে গেছি…”
সেদিনই— তোমার পরিবর্তন শুরু হবে।





