আমাদের পাপ-পুণ্য কি সবই শ্রীকৃষ্ণ করান?গীতার মতে আসল সত্য কী

হিন্দুধর্মে এই বাক্যের প্রকৃত অর্থ হলো—  

এই সমগ্র জগৎ, জগতের সমস্ত নীতি, ধর্ম, অধর্ম, কর্মফল—সবই শ্রীকৃষ্ণের স্থির করা মহাজাগতিক ব্যবস্থার অন্তর্গত।  

কিন্তু এর মানে এই নয় যে, কৃষ্ণ আমাদেরকে দিয়ে পাপ করান।

সমুদ্রের উপর দিয়ে একটি নৌকা চলছে।  

সমুদ্র—কৃষ্ণের সৃষ্টি করা পরিবেশ।

এবার নৌকার দিক কোনদিকে যাবে,  

সেটা ঠিক করে নৌকার মাঝি—অর্থাৎ আমরা নিজেরাই।

শ্রীকৃষ্ণ সমুদ্র দিলেন, হাওয়া দিলেন, পথ দিলেন…  

কিন্তু নৌকাটা কোনদিকে চালাব—তার স্বাধীনতা দিলেন আমাদের।

এই স্বাধীনতাই হলো জীবের “স্বাধীন ইচ্ছা” (Free Will)।

না!  

শ্রীকৃষ্ণ কাউকে পাপ করতে বাধ্য করেন না।  

শ্রীকৃষ্ণ শুধু পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন।

যখন মানুষ নিজের প্রকৃতি, নিজের বুদ্ধি, নিজের সংস্কার দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়…  

যখন কাম, ক্রোধ, লোভের বশবর্তী হয়ে ভুল করে—  

সেটা তার নিজের সিদ্ধান্ত।

কৃষ্ণ শুধু দেখেন—  

এই সিদ্ধান্তের ফল তাকে কী শিক্ষা দেবে।

যদি কৃষ্ণই আমাদের দিয়ে পাপ করাতেন,  

তাহলে কৃষ্ণ কেন গীতায় বলবেন—  

“উদ্ধরেদ্‌ আত্মনাত্মানং”—নিজেকেই নিজেকে উত্তোলন করতে হবে।

কেন বলবেন—  

“যে যেমন ভাবে আমাকে স্মরণ করে, আমি তাকে সেইরূপই ফল দিই।”

গীতার ১৮ অধ্যায়ে কৃষ্ণ অর্জুনকে বললেন—  

“আমি তোমাকে জ্ঞান দিলাম—এখন তুমি বিবেচনা করে, শুভাশুভ যা ইচ্ছা কর।”

এখানেই বোঝা যায়—  

কৃষ্ণ পথ দেন, আলো দেন, জ্ঞান দেন—  

কিন্তু চলার সিদ্ধান্ত দেন মানুষের হাতে।

অর্জুনের সামনে দুই পথ রাখলেন কৃষ্ণ—  

কিন্তু হাঁটলেন কে? অর্জুনই।

অর্জুনের হাতে অস্ত্র ছিল।  

কৃষ্ণ শুধু রথ চালিয়েছেন।  

তীর ছুঁড়েছে অর্জুন।  

সিদ্ধান্ত নিয়েছে অর্জুনই।

আপনার জীবনের রাশ কৃষ্ণ ধরেন,  

কিন্তু পাপ-পুণ্যের সিদ্ধান্ত—  

কখনোই কৃষ্ণ নেন না।  

আপনিই নেন!

আপনি পাপ করলে—  

সেটা আপনার সিদ্ধান্ত।

কিন্তু সেই পাপের ফলভোগের ব্যবস্থাটি করেন কৃষ্ণ।

আগুন সৃষ্টি করেছেন কৃষ্ণ,  

কিন্তু আপনি আগুনে হাত দিলে আপনাকেই পোড়াবে।  

এটাই কৃষ্ণের বিশ্বব্যবস্থা।

“শ্রীকৃষ্ণের অনুমতি ছাড়া একটি গাছের পাতাও নড়ে না।  

কিন্তু তুমি কোন পথে হাঁটবে,  

সেই সিদ্ধান্ত তোমাকেই নিতে হয়।”

কৃষ্ণ পথ তৈরি করেন,  

আর তুমি সেই পথে চলার মাধ্যমে  

নিজের ভাগ্য—নিজের মুক্তি—নিজের পতন—সব লিখে ফেলো।

মনে গেঁথে নিন—

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সবকিছু চালান, কিন্তু আপনাকে জোর করে চালান না।

যেদিন কেউ ভাবতে শুরু করে—  

“আমি যা করি, কৃষ্ণই করাচ্ছেন”—  

সেদিন সে নিজের বিবেককে হত্যা করে ফেলেছে।

এটা শুধু ভুল নয়—এটা মহাপাপ!

স্বাধীন ইচ্ছা—এটাই মানুষের মহাশক্তি।  

এই শক্তি অন্য কোনো জীবকে কৃষ্ণ দেননি।

আপনি চাইলে সত্যের পথে হাঁটতে পারেন,  

আপনি চাইলে অন্ধকারেও ঝাঁপ দিতে পারেন।  

এটা আপনার নিজের ইচ্ছা।

“কৃষ্ণ করিয়েছেন”—এই কথা বলা মানে পাপকে কৃষ্ণের ঘাড়ে চাপানো।

আপনি নিজের হাতে পাপ করবেন…  

লোভ করবেন… মিথ্যা বলবেন… কামনায় ডুববেন…

তারপর বলবেন—“সব কৃষ্ণ করিয়েছেন”?  

এটা কেমন সাহস?

আপনার কামনা, আপনার লোভই আপনাকে টানে।  

কৃষ্ণ শুধু দেখেন—  

আপনি নিজের শক্তি কোথায় ব্যবহার করছেন।

যে হৃদয়ে কৃষ্ণের স্মরণ থাকে—  

সেই হৃদয়ে পাপ প্রবেশ করতে পারে না।

কৃষ্ণ-স্মরণ হলো আগুন—  

যে আগুনে পাপের বীজ মুহূর্তেই ছাই হয়ে যায়।

যারা কৃষ্ণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়—  

তারা নিজেরাই নিজের শত্রু হয়ে যায়।

তাদের ইচ্ছা তাদেরকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।  

তারা ভোগে, কামনায়, লোভে বেঁচে থাকে।

বাহিরে স্বাধীন মনে হলেও—  

আসলে তারা নিজের কামনার দাস।

ফল—  

আবার জন্ম… আবার মৃত্যু… আবার দুঃখ…  

এটাই তাদের নিয়তি।

কারণ মানুষ কৃষ্ণকে ছাড়ে—  

কৃষ্ণ কাউকে ছাড়েন না।  

মানুষ নিজেই পথ হারায়।

শ্রীকৃষ্ণ আপনাকে পাপ করতে বাধ্য করেন না।  

আপনি যেদিকে হাঁটবেন—  

তার ফল আপনিই পাবেন।

আপনি যদি কৃষ্ণকে ধরেন—  

তিনি আপনাকে টেনে তুলবেন।

আর আপনি যদি কৃষ্ণকে ছাড়েন—  

তাহলে আপনাকে কেউ রক্ষা করতে পারবে না।

আমরা আজ জড়জগতে বন্দী।  

জন্ম–মৃত্যুর চক্রে পিষ্ট।  

সুখ–দুঃখে দৌড়াচ্ছি আমরা।

কেন?

কারণ আমরা কৃষ্ণবিমুখ।  

শ্রীকৃষ্ণ থেকে মুখ ফিরিয়েছি বলেই—  

আজ আমরা নিজেরাই নিজের সর্বনাশ করছি।

অনেকে বলেন,  

“কৃষ্ণই সব করেন, তিনিই করাচ্ছেন…”

না!

এ কথা বলা মানে,  

নিজের পাপের দায় কৃষ্ণের ঘাড়ে চাপানো।

এটা অভক্তের প্রলাপ—  

অসুরের যুক্তি।

কৃষ্ণ আপনাকে ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন,  

আপনি সেই শক্তিকে ফেরত দেননি।

বরং সেই শক্তি দিয়ে—  

ভোগে ছুটেছেন,  

অহংকারে ছুটেছেন,  

কামনায় ডুবেছেন।

এবং শেষে বলছেন—  

“আমি করিনি, কৃষ্ণ করিয়েছেন!”

এটা কি ভক্তের ভাষা?  

এটা পাপীর সর্বনাশী অজুহাত!

“যেন তেন প্রকারেণ কৃষ্ণে মনঃ নিবেশঃ”—  

এই কথার ভিতরে লুকিয়ে আছে মুক্তির গোপন দরজা।

শাস্ত্র চিৎকার করে বলে—  

যেভাবেই হোক, মনটা কৃষ্ণের চরণে দাও!  

মনের দিকটা কৃষ্ণের দিকে ঘোরাও!

আমাদের এই একটাই কাজ,  

এই একটাই কর্তব্য,  

এই একটাই পথ।

এ পথ এড়িয়ে গেলে—  

আপনি হাজার বছর সাধনা করলেও,  

হাজার নাম জপ করলেও—  

কোনো লাভ নেই।

মন যদি কৃষ্ণে না লাগে—  

তাহলে প্রতিটি কাজ,  

জন্মের পর জন্ম,  

আপনাকে দগ্ধ করবে।

অনেকে বলেন—  

“জড় জগতে এসেছি আনন্দ করবো,  

কিন্তু ভগবানকে আগে ডাকতে হবে কেন আমাকে?”  

এটা ভক্তি নয়,  

এটা অহংকারের কণ্ঠস্বর।

অনেকে আরও বলেন—  

“ভগবান আগে ডাকুক,  

তখন আমি তার দিকে ফিরবো!”  

এই কথা বলা মানেই—  

অসীম অহংকারে ডুবে থাকা।

কৃষ্ণ কি আপনার চাকর?  

তিনি কি এসে তোষামোদ করবেন?  

তিনি কি আপনার পায়ে পড়ে বলবেন—  

“আমায় একটু মনে করো?”

না!

এটা ভক্তির ভাষা নয়।  

এটা অজ্ঞতার অন্ধকারে গলা ডুবিয়ে থাকা মানুষের আর্তনাদ।

ভগবান কৃষ্ণ বলেন—  

“তোমার মনের অধিকারটা আমায় দাও।”

তিনি চান না—  

আপনার অর্থ,  

আপনার গর্ব,  

আপনার বড়ত্ব।

তিনি শুধু চান—  

আপনার মনটা।

তিনি বলেন—  

“তুমি শুধু আমার ভক্ত হও।  

বাকিটা আমি সামলে নেব।”

যেদিন আপনি নিজের ইচ্ছাকে  

শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছার সাথে মিলিয়ে দেবেন—

সেদিন থেকেই  

আপনার দায়িত্ব কৃষ্ণের কাছে চলে যাবে।

আপনি হবেন সুরক্ষিত।  

আপনি হবেন কৃষ্ণের আদরের ধন!

আপনি কৃষ্ণকে ধরলে—  

কৃষ্ণ আপনাকে তুলে নেবেন।

আর আপনি কৃষ্ণকে ছেড়ে দিলে—  

আপনাকে কেউ রক্ষা করতে পারবে না।

তাই আজই সিদ্ধান্ত নিন—  

ইচ্ছাশক্তিকে কৃষ্ণের হাতে তুলে দিন।

তাহলে জড়জগতের সুখ–দুঃখ, পাপ–পুণ্য, জন্ম–মৃত্যু—  

সবকিছুর উপরে উঠে,  

নিত্যানন্দময় জীবনে পৌঁছে যাবেন।

Leave a Comment