অনেকে বলে— স্বর্গ-নরক বলে কিছুই নেই, সবই মানুষের মনের ভিতর। তাহলে একটা প্রশ্ন— যদি সবকিছু মানুষের মনের মধ্যে হয়, তাহলে আমরা হরিনাম করব কেন?মানুষ আজ একটা কথা খুব সহজে বলে— মরার পর কিছুই নেই…
এই কথাটা কেন এত জনপ্রিয় জানো? কারণ— এতে কোনো ভয় নেই, কোনো জবাবদিহি নেই, এবং পাপের কোনো ফল নেই। মানে—যা খুশি তুমি করো। কিন্তু… সত্য কি এতোই সস্তা? সত্য কি তোমার ইচ্ছামতো বদলাবে? না।
সত্য তোমার বিশ্বাসের উপর নির্ভর করে না। তুমি এখন কোথায় দাঁড়িয়ে আছো? এই পৃথিবীতে।
এটা কি তোমার মনের ভ্রম? না… এটা একটা বাস্তব গ্রহ। এখানে মাটি আছে, আকাশ আছে, এই গ্রোহের নিয়ম আছে।এবং সেই নিয়মের মধ্যেই আমরা বেঁচে আছি।
মৃত্যুর পরে স্বর্গ ও নরক নিয়ে বিজ্ঞান কী বলে?

আজ বিজ্ঞান নিজেই বলছে— এই মহাবিশ্বে কোটি কোটি গ্রহ আছে… এবং কোটি কোটি গ্যালাক্সি আছে। একটা গ্যালাক্সিতে যেমন কোটি কোটি নক্ষত্র, ঠিক তেমনি প্রতিটা নক্ষত্রের চারপাশে ঘুরছে অনেক গ্রহ।
আমাদের এই পৃথিবী, এটা সেই অসীম সৃষ্টির একটা ক্ষুদ্র বিন্দু মাত্র। আমরা একটা ছোট্ট গ্রহে দাঁড়িয়ে, পুরো মহাবিশ্বের সত্যকে বিচার করছি! এটাই আমাদের অহংকার। যখন বিজ্ঞানই বলছে অসংখ্য জগত আছে।
তখন শাস্ত্র যদি বলে— স্বর্গলোক আছে, নরকলোক আছে, তাহলে সেটা কি অসম্ভব? না… অসম্ভব না। কারণ—আমাদের চোখ সীমিত, আমাদের জ্ঞান সীমিত, কিন্তু সৃষ্টি জগত অসীম। আমরা যা দেখি, সেটুকুই সত্য— এই ধারণাটা ভুল।
মৃত্যুর পরে কিছু আছে কি? সাংবাদিককে চমকে দিয়েছিলেন স্বামী প্রভুপাদ

A C Bhaktivedanta Swami Prabhupada-কে একবার এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন— মহারাজ, আপনি সারাদিন হরিনাম করেন, সারা পৃথিবীতে কৃষ্ণভক্তি প্রচার করছেন। কিন্তু যদি মৃত্যুর পরে গিয়ে দেখেন— স্বর্গ নেই… নরক নেই… এবং কৃষ্ণ বলে কিছু নেই… তখন কি হবে আপনার?
প্রশ্নটা খুব কঠিন, কিন্তু প্রভুপাদের উত্তর— আরও গভীর। তিনি বললেন— আমি যদি মৃত্যুর পরে গিয়ে দেখি কিছুই নেই— তবুও আমার কোনো ক্ষতি নেই। কেন? কারণ— আমি এই জীবনে শান্তি পেয়েছি, হরিনাম করে আনন্দ পেয়েছি, কৃষ্ণ প্রসাদ খেয়ে তৃপ্তি পেয়েছি, অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি, এবং সম্মান, যশ, খ্যাতি—সবই পেয়েছি। আমার জীবনটাই সফল!
তারপর তিনি বললেন— আর তুমি যদি এই সব কিছু না করো, এই ভেবে যে,মৃত্যুর পরে কিছু নেই, তাহলে— তুমি এই জীবনেও কষ্ট পাবে, আর যদি মৃত্যুর পরে সত্যিই কিছু থাকে— তাহলে তুমি তো ফেঁসে যাবে!
তুমি কি কখনো ভেবে দেখেছো— স্বর্গ-নরক বিশ্বাস করলে আসলে কী ক্ষতি? একটু গভীরভাবে চিন্তা করো…
ক্ষতি তো নেইই, বরং আছে বিশাল লাভ। লাভটা কী? এই জীবনে— তুমি একটা নিয়ন্ত্রিত, শুদ্ধ জীবন যাপন করতে পারবে। তোমার ভিতরে জন্ম নেবে ভক্তি, নম্রতা আর শান্তি।
তুমি বুঝতে শিখবে— কোনটা ঠিক, আর কোনটা ভুল। তোমার জীবনটা তখন শুধু কাটবে না…অর্থপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এবার অন্য দিকটা ভাবো— ধরো, তুমি স্বর্গ-নরক বিশ্বাস করো। ভক্তি করো, হরিনাম করো, এবং সৎ জীবন যাপন করো… কিন্তু মৃত্যুর পরে যদি কিছু নাই থাকে? তাহলেও তো তোমার কোনো ক্ষতি নেই!
কারণ— তুমি এই জীবনটাই সুন্দরভাবে, শান্তিতে কাটিয়ে গেলে। কিন্তু… যদি তুমি মৃত্যুর পরের জীবন বিশ্বাসই না করো— না ভক্তি, না হরিনাম, না কোনো নিয়ম। আর যদি সত্যিই মৃত্যুর পরে স্বর্গ-নরক থেকে থাকে?তখন কী হবে?
তখন তো তুমি সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত। কোন পথ ধরবে, কোথায় যাবে— কিছুই জানবে না।
অন্যদিকে—যারা হরিনাম করে, ভগবানের নাম স্মরণ করে,তারা এই জীবনেও শান্তি পায়… আর যদি মৃত্যুর পরে কিছু থাকে— তাহলে তারা পায় শ্রীকৃষ্ণের চরণে আশ্রয়।
অর্থাৎ— দুই দিক থেকেই লাভ। এই জীবনেও শান্তি, আর পরের জীবন থাকলে চিরশান্তি।
তাহলে একবার নিজেকে জিজ্ঞাসা করো— ঝুঁকি কোন দিকে বেশি?
বিশ্বাস করে চললে— কোনো ক্ষতি নেই, শুধু লাভ। আর বিশ্বাস না করলে— হতে পারে সবচেয়ে বড় ক্ষতি। তাই বুদ্ধিমান মানুষ কী করবে? সে এমন পথ বেছে নেবে— যেখানে দুই দিকেই জয়। আমাদের জীবনটা খুব ছোট…
কিন্তু এর পরের যাত্রা— হতে পারে অসীম। তাই এখন নিজেকে বলুন, শুধু এই পৃথিবীতেই সব শেষ? নাকি এর বাইরেও কিছু আছে। এখন সিদ্ধান্ত তোমার! কিন্তু মনে রেখো— যে পথ তোমাকে শান্তি দেয়, যে পথ তোমাকে ভালো মানুষ বানায়, যে পথ তোমার জীবনকে অর্থপূর্ণ করে— সেই পথ কখনো ভুল হতে পারে না।হয়তো… সেটাই সত্যের পথ।
স্বর্গ-নরকে কি মানুষ চিরকাল থাকে?
স্বর্গ যেখানে দুঃখ নেই, যেখানে সৌন্দর্যের শেষ নেই, এবং যেখানে দেবতারা আনন্দে বাস করেন।স্বর্গ এমন এক জায়গা, যেখানে প্রতিটা মুহূর্ত আনন্দে ভরা… কোনো ভয় নেই, এবং কোনো অভাব নেই। কিন্তু… এটা চিরস্থায়ী না।
পুণ্য শেষ হলে স্বর্গের সুখ শেষ।
এবার নরকের কথা ভাবুন… সেখানে আছে গভীর অন্ধকার, চিৎকার, যন্ত্রণা। এখানে— পাপী আত্মাকে আগুনে পোড়ানো হয়, শরীর ছিন্নভিন্ন হয়, এবং বিষাক্ত যন্ত্রণা দেওয়া হয়। আর নরকের সবচেয়ে ভয়ংকর জিনিসটা হলো — তুমি এখানে মরতে পারো না। তোমার কষ্ট হচ্ছে… কিন্তু শেষ নেই। এটাই নরক।
শাস্ত্র বলছে— নরকে মানুষ যাতনা শরীর পায়। মানে— এমন শরীর… যা শুধু কষ্ট সহ্য করার জন্য তৈরি। আপনারা ভেবে দেখুন — আপনার শরীর আগুনে জ্বলছো… তবুও মরছো না। ছিন্নভিন্ন হচ্ছো শরীরটা, তবুও শেষ হচ্ছে না।
এইটা কল্পনা না, এইটা বিচার।
নরক কী শুধু মৃত্যুর পরে?
না। আমাদের এই পৃথিবীতেই— মাতৃগর্ভে ভ্রূণের কষ্ট, ক্যান্সারের যন্ত্রণা, যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং দুষ্ট লোকের অত্যাচার।

এসব দুঃখ যন্ত্রণা আমাদের পৃথিবীতে ভোগ করতে হয়! এই সবই— নরকের ট্রেলার। মানুষ ভাবে— টাকা পেলে সুখ পাবো, ভোগ মানেই স্বর্গো। কিন্তু… এই সুখ কতক্ষণ থাকে? আজ আছে… কাল নেই।
এটা স্বর্গ না— এটাই মায়ার ফাঁদ। সবচেয়ে বড় সত্যো হলো— তুমি এখন মানুষ। মানে— তুমি পরীক্ষায় আছো। তোমার প্রতিটা কাজ, প্রতিটা সিদ্ধান্ত, সবই নিখুঁত হিসাব হচ্ছে।
তাহলে হরিনাম কেন করা উচিত?
কারণ— তুমি দুর্বল, তোমার মন অস্থির, এবং তুমি ভুল করতে বাধ্য। কিন্তু— হরিনাম তোমাকে সৎ পথে টেনে আনে… অন্ধকার থেকে আলোয়। তুমি যদি ভাবো— স্বর্গ নরক সব মনের ভেতর।
তাহলে শুনে রাখো— আগুনকে অস্বীকার করলে… আগুন তোমাকে ছাড়বে না।
ঠিক তেমনি— স্বর্গ-নরক অস্বীকার করলে… ফল থেকে বাঁচতে পারবে না। আজ নিজেকে জিজ্ঞেস করুন… আমি কি প্রস্তুত,আমার কর্মফলের জন্য? কারণ— সময় চলে যাচ্ছে, সুযোগ শেষ হয়ে যাচ্ছে… যে কোন মুহূর্তে প্রাণবায়ু বেরিয়ে যেতে পারে। স্বর্গ-নরক বিশ্বাস করো বা না করো— ওগুলো তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। কিন্তু হরিনাম… এটাই তোমার শেষ আশ্রয়।





