ভাগ্য নাকি কর্ম—জীবনের ভবিষ্যৎ আসলে কীসে নির্ভর করে!

মানুষ যখন কিছুই করতে পারে না, তখন কী বলে?“সবই বিধির বিধান…আমার কিছু করার নেই…”কি সুন্দর অজুহাত!নিজের ব্যর্থতা লুকানোর সেরা ঢাল!কিন্তু আজ শুনো—এই কথাটা সত্যের মুখে থুতু ছোঁড়ার মত কথা।হ্যাঁ, নিয়তি আছে।হ্যাঁ, জন্ম-জন্মান্তরের কর্মফল আছে।হ্যাঁ, অতীতের কর্ম তোমাকে আজ সুখ বা দুঃখ দিচ্ছে।কিন্তু এতেই শেষ?তুমি কি শুধু কর্মফলের দাস?তুমি কি নিজের জীবনের চালক নও?তাহলে কৃষ্ণ তোমাকে স্বতন্ত্র ইচ্ছা কেন দিলেন?কেন দিলেন নিজের চয়ন করার ক্ষমতা?কারণ সত্য হচ্ছে—নিয়তি পথ দেখায়,কিন্তু সেই পথে হাঁটা তোমার সিদ্ধান্ত।নিয়তি হলো গাইড—কিন্তু ড্রাইভার তুমি!

যদি তুমি আজ গরিব হও—নিয়তি তোমাকে গরিব বানায়নি।তোমার অতীত কর্মফল সেই অবস্থায় রেখেছে।কিন্তু আজ যদি তুমি দাঁড়িয়ে বলো—“আমি বদলাবো!”তাহলে নতুন নিয়তি তৈরি হবে।দুঃখ তোমার অতীতের কারণে—কিন্তু সুখ তোমার বর্তমান পরিশ্রমে।ব্যর্থতা তোমার পুরোনো কর্ম—কিন্তু সাফল্য তৈরি হবে তোমার আজকের সিদ্ধান্তে।

নিয়তি বাঁধা নয়—বাঁধা হচ্ছে তোমার নিজের আলসেমি।এই সত্যটা শুনে গায়ে জ্বালা লাগলে—ভালো।কারণ সত্য কখনো আরাম দেয় না—সত্য ছাই করে দেয় অলসতা।

অনেক মানুষের মনে ভুল ধারণা আছে—যারা বলে ‘সবই বিধির বিধান’, তারা আসলে ভয় পায়।তারা চেষ্টা করতে ভয় পায়।পরিশ্রম করতে ভয় পায়!নিজেকে বদলাতে ভয় পায়।সেই ভয় লুকানোর জন্যই—এই অজুহাত বানায়:“বিধি এটাই লিখে দিয়েছে…”না!বিধি তোমার অতীত লিখে দিয়েছে—কিন্তু ভবিষ্যৎ এখনো ফাঁকা!কলম তোমার হাতে!

লিখবে কি না—তা তোমার সিদ্ধান্ত!নিয়তি তোমার অতীতের জমা কর্মফল।কিন্তু ভবিষ্যৎ তোমার হাতে তৈরি হবে!

ভাগ্য লেখা নয়—ভাগ্য বানাতে হয়।বিধি বাঁধা নয়—বাঁধা তুমি নিজে!

আজ তুমি যদি বদলে যাও—নিয়তিও তোমার পায়ের নিচে মাথা নত করবে।তুমি যদি আজও বলো—“সবই বিধির বিধান”— তাহলে বুঝে নাও,তুমি নিজের ক্ষমতা, নিজের জীবন, নিজের ঈশ্বর-দেওয়া স্বাধীনতা—সব মেরে ফেলছো নিজের হাতে।কিন্তু তুমি যদি আজ দাঁড়াও,এবং বলো—“আমি বদলাবো!”তাহলে মনে রেখো—বিধিও তোমার ভবিষ্যৎ থামাতে পারবে না।নিয়তিও তোমার সামনে হার মানবে!ভাগ্য তোমার হাতে নতুনভাবে জন্ম নেবে।

আজ আমি আপনাকে এমন একটা সত্য কথা বলবো,যা শুনলে হৃদয়ের শিরা-উপশিরা ছিঁড়ে যাবে।যা শুনলে মাথার উপর বজ্রপাত নেমে আসবে।শুনুন…দুই রাজা,দুই দানবীর—এবং দুই মহামানব।কর্ণ, ও বলি মহারাজ!দু’জনই দান করে ইতিহাস কাঁপিয়ে গেছে।কিন্তু প্রশ্ন হলো—ভগবান তাদের এত ভালোবাসতেন, তবুও কেন বাঁচালেন না?এই প্রশ্নের উত্তর আপনার ভেতরের মায়া ভেঙে ফেলবে,আপনার ভেতরের অহংকারকে টুকরো টুকরো করবে,কারণ এর জবাব আগুনের মতো।

দানের মানে বোঝেন? আপনি যা জানেন, সব ভুল।মানুষ ভাবে দান মানে কয়েন ফেলা।মানুষ ভাবে দান মানে পুরোনো জামা দেওয়া।না!দান মানে নিজের অহংকার ভেঙে ফেলা।

দান মানে—“যা আমার বলে ভাবছি, সেটা আসলে আমার নয়”—এই সত্য বুঝে ফেলা।

দারিদ্র্যকে দান করলে পূণ্য হয়—কিন্তু ভগবানকে দান করলে?ভগবত ভক্তকে দান করলে?সেখানে জ্বলে ওঠে জন্ম জন্মান্তরের পাপ।সেখানে সাফ হয়ে যায় জীবনের দূষণ।

কর্ণ—দানবীরের রক্তে আগুন ছিল।তিনি শুধু দাতা ছিলেন না,তিনি দানের আগুন ছিলেন।লোকে দান করে বাকি টাকা রেখে দেয়—মানুষ দান করে,১০০ টাকার ভিতরে ৫ টাকা!কর্ণ দান করতেন মৃত্যুর মুখেও দাঁড়িয়ে।একশো বছরেও এমন দাতা খুঁজে পাওয়া যাবে না!কর্ণ এত দানবীর থাকা সত্ত্বেও,তবুও ভগবান তাকে বাঁচালেন না। কেন?কারণ—দানবীর হলেও তিনি দাঁড়িয়েছিলেন অধর্মের পক্ষে।তিনি হাত বাড়িয়েছিলেন দুরাচারীদের রক্ষায়।তিনি নিজের শক্তি দিয়েছিলেন পাপীদের সাম্রাজ্য শক্তিশালী করতে।ভগবান কি কখনো ভক্তের শত্রুকে রক্ষা করেন?না।কর্ণের রথচক্র মাটিতে ডুবে ছিল না—ডুবে ছিল তার নিজের কর্মে।মানুষ ভাবে কৃষ্ণ ছল করলেন—কিন্তু না!কৃষ্ণ ছল করেন না।কৃষ্ণ বিচারের হাতিয়ার।যারা পাপে দাঁড়িয়ে থাকে, তাদের বাঁচানোর নাম কৃষ্ণ নয়।তাদের শেষ করার নামই হলো কৃষ্ণ!

কর্ণের মৃত্যু অন্যায় ছিল না—তার মৃত্যু ছিল ধর্মের বিজয়।কিন্তু তাকে নরকে কেন পাঠালেন? না!তাকে নরকে পাঠানো হয়নি!তাকে স্বর্গে পাঠিয়েছিলেন।কারণ দান তার রক্তে ছিল।শুদ্ধতা তার চরিত্রে ছিল।এবং ভুল ছিল—তার অবস্থানে!

এবার আসুন বলি মহারাজের কথা শুনুন…যিনি দানে কর্ণকেও ছাড়িয়ে গেছেন।তিনি দান করলেন ধন নয়,গরু নয়,

জমি-জায়গা নয়—তিনি দান করলেন নিজের অহংকার।নিজের সাম্রাজ্য।এবং নিজের জীবন!যখন বামনদেব এলেন তিন পা ভূমি চাইতে—বলি বললেন,“নাও, যা চাইবে, আমি তাই দেব।”গুরু শুখ্রাচার্য বললেন—“এটা বামন নয়।এটা সহং নারায়ণ।”বলি উত্তর দিলেন—“তাই যদি হয়, তবে তো আরও দেব।”এই কথাগুলো স্বর্ণে বাঁধিয়ে রাখার মতো।

এটাই দান।এটাই আত্মসমর্পণ।এটাই মহত্ত্ব।যখন বামন প্রথম পা রাখলেন—আকাশ ভরে গেল।দ্বিতীয় পা রাখলেন—পৃথিবী ঢেকে গেল।তৃতীয় পা রাখবে কোথায়?বলি মাথা এগিয়ে দিলেন।যেখানে অহংকার ভাঙে,সেখানে ভগবান পা রাখেন।যেদিন মানুষ বলে “প্রভু সব তোমার”,সেদিন ভগবান বলে— “তুমিও আমার।”

আর শেষে বলি মহারাজকে করলেন সুতল লোকের রাজা।ভগবান নিজে প্রহরী হয়ে দাঁড়ালেন।ভাবুন তো!ভগবান নিজে পাহারা দিচ্ছেন তাঁর কাছে দান করা ভক্তকে।

তাহলে দু’জনকে বাঁচানো হলো না কেন?কর্ণকে ভগবান যুদ্ধক্ষেত্রে বাঁচালেন না—কারণ তিনি দাঁড়িয়েছিলেন অসত্যের পক্ষে।বলি মহারাজকে রক্ষা করলেন না—কারণ ভগবান তাঁকে আরও বড় রাজ্য দিতে চেয়েছিলেন।মানুষ ভাবে—

“ভগবান বাঁচালেন না মানেই শাস্তি।”কিন্তু না!এটা আপনার ভুল ধারণা।ভগবান কখনো, আপনি যা চান, তা দেন না—ভগবান আপনাকে তাই দেন যা আপনার প্রাপ্য!কর্ণের প্রাপ্য ছিল স্বর্গ।বলি মহারাজের প্রাপ্য ছিল অমর সান্নিধ্য।তাই ভগবান ভিন্ন ভিন্ন পথে তাদের সেই পুরস্কার দিলেন।

মানুষ ভাবে—“আমি দান করলে কমে যাবে।”এই চিন্তা হলো নরকের প্রথম দরজা।

আপনি যদি দান না করেন—আপনি দুঃখ পাবেন।আপনি অস্থির থাকবেন।আপনার জীবন ফাঁকা লাগবে।কারণ, প্রকৃতির আইন হলো—যা দেবেন, তাই পাবেন।যা জমাবেন, তা হারাবেন!

যারা নিজেরে ধরে রাখে—তারা শেষ জীবনে খালি হাতে মারা যায়।যারা দান করে—তারা মৃত্যুর পর ভগবানের হাতে ধরা পড়ে।কর্ণ হেরেছিলেন যুদ্ধে—কিন্তু জিতেছিলেন স্বর্গ।বলি হারিছিলেন রাজ্য—জিতেছিলেন ভগবানকে।

আপনি কোনটা চান?ভোগ, অহংকার, সম্পদ?না কি ভগবানের কৃপা!ভেবে দেখুন—আপনি এই পৃথিবীতে কি রেখে যাবেন।একটা ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স?দুটি দালান?কয়েকটা লোকসভার ভাঙা স্মৃতি?সব মাটি হয়ে যাবে।

শুধু থাকবে—আপনার দান,আপনার ভক্তি,আপনার সত্য।ভগবান কর্ণকে বাঁচালেন না—কারণ কর্ণ সত্যে দাঁড়ায়নি।ভগবান বলিকে বাঁচালেন না—কারণ তাঁকে আরও বড় কিছু দিতে চেয়েছিলেন।এটাই শিক্ষা—অধর্মে দাঁড়ালে করুণা নয়, বিচার আসে।ধর্মে দাঁড়ালে ক্ষতি নয়, ভগবান আসেন।আজ মনে রাখুন—দেওয়া কমায় না—দেওয়া বাড়ায়।

দান নিঃস্ব করে না—দান আপনাকে অসীম করে।যেদিন আপনি বলবেন “হে ভগবান, সব তোমার”—সেদিন ভগবান বলবেন— “হে ভক্ত, তুমিও আমার।”

Leave a Comment